বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এমন কয়েকটি প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা শুধু রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতিই বদলাবে না, বরং দেশের লাখো মানুষকে প্রথমবারের মতো সরাসরি কর প্রশাসনের আওতায় নিয়ে আসবে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা অগ্রিম কর ফেরত পেতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। শুধু তাই নয়, শহর এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাটের বণ্টন, মিউটেশন (নামজারি) কিংবা মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। অন্যদিকে বিনিয়োগে কর রেয়াতের সুবিধা কমানো হয়েছে। তবে করদাতাদের জন্য সুখবরও রয়েছে। আগামী বছর থেকে সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন দিলে কর ছাড় পাওয়া যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে করজাল সম্প্রসারণ, সম্পদ ও আয়ের তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং কর ফাঁকি কমানো। তবে এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন প্রশাসনিক চাপও তৈরি হতে পারে।
কর ব্যবস্থার নতুন দর্শন
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো কর-জিডিপি অনুপাতের নিম্ন অবস্থান। দেশের অর্থনীতি বড় হলেও করদাতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, দেশে কোটি কোটি মানুষ ব্যাংকিং, সম্পত্তি ও বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা এখনো খুব সীমিত।
এই বাস্তবতায় সরকার কর সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে সম্পদ, আয় ও আর্থিক লেনদেনের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কর প্রশাসন এখন আর শুধু কর আদায়ের দিকে নয়, বরং নাগরিকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরির দিকে এগোচ্ছে।
সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বাস্তবতা
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা করের নতুন নিয়ম। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্দিষ্ট হারে কর কেটে রাখা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটিই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ অতিরিক্ত কর কাটা হলেও তা ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল না।
নতুন ব্যবস্থায় উৎসে কেটে রাখা করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থবছর শেষে করদাতা রিটার্ন জমা দিয়ে তাঁর প্রকৃত কর দায় নির্ধারণ করবেন। যদি দেখা যায় যে কেটে রাখা করের পরিমাণ প্রকৃত করের চেয়ে বেশি, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।
প্রথম দৃষ্টিতে এটি করদাতাদের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ মনে হলেও বাস্তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন শর্ত। কর ফেরত পেতে হলে অবশ্যই টিআইএন থাকতে হবে এবং রিটার্ন জমা দিতে হবে।
ফলে এতদিন যারা করযোগ্য আয়ের বাইরে থাকার কারণে টিআইএন নেননি, তারাও কর প্রশাসনের আওতায় আসতে বাধ্য হবেন।
মধ্যবিত্তের ওপর বাড়বে চাপ?
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকার কম সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এদের বড় অংশই অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, গৃহিণী, ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। অনেকেরই করযোগ্য আয় নেই। ফলে তারা কখনো টিআইএন নেননি কিংবা রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।
কিন্তু এখন যদি তারা মুনাফা থেকে কেটে রাখা কর ফেরত পেতে চান, তাহলে টিআইএন নিতে হবে, রিটার্ন দাখিল করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কর ফেরতের আবেদন করতে হবে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে করদাতার সংখ্যা বাড়বে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে কর প্রশাসনের ওপরও চাপ বাড়বে। কারণ লাখো নতুন করদাতার রিটার্ন গ্রহণ, যাচাই এবং কর ফেরতের আবেদন নিষ্পত্তি করা সহজ কাজ নয়।
জমি-ফ্ল্যাটের মালিকদের জন্য নতুন শর্ত
বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে জমি ও ফ্ল্যাটের নামজারির সঙ্গে আয়কর রিটার্নকে যুক্ত করা। বর্তমানে জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়, হস্তান্তর বা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন নিয়ম কার্যকর হলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের বণ্টন ও মিউটেশনের ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। অর্থাৎ কেউ সম্পত্তি কিনে মালিকানা নিজের নামে নিতে চাইলে প্রথমেই তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
এনবিআরের যুক্তি হলো, বর্তমান বাজারে শহর এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের মূল্য এত বেশি যে করযোগ্য আয় না থাকা ব্যক্তির পক্ষে এমন সম্পদ অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তাই সম্পত্তির মালিকদের কর নথির আওতায় আনা যৌক্তিক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত আয়ের ব্যবহার কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বা পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
চেয়ারম্যান হতে হলেও লাগবে রিটার্ন
কর ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক জবাবদিহিতার সঙ্গে যুক্ত করারও চেষ্টা দেখা যাচ্ছে এবারের বাজেটে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চাইলে প্রার্থীকে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে।
এর ফলে জনপ্রতিনিধিদের কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
বাড়ছে রিটার্নের গুরুত্ব
বর্তমানে প্রায় ৩৯ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়।
এর মধ্যে রয়েছে ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ নবায়ন, আবাসিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, উচ্চমূল্যের সঞ্চয়পত্র ক্রয়, গাড়ির নিবন্ধন ও মালিকানা পরিবর্তন, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স গ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম।
নতুন বাজেটের পর রিটার্নের গুরুত্ব আরও বাড়বে। অনেক ক্ষেত্রেই রিটার্ন কেবল কর প্রদানের দলিল নয়, বরং নাগরিকের আর্থিক পরিচয়ের অন্যতম প্রমাণপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
বিনিয়োগে কর ছাড় কমল
করদাতাদের জন্য বড় একটি পরিবর্তন এসেছে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত সুবিধার ক্ষেত্রে। এতদিন মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত হিসাব করা যেত এবং সর্বোচ্চ সুবিধার সীমা ছিল ১০ লাখ টাকা। নতুন প্রস্তাবে বিনিয়োগের মাত্র ১০ শতাংশ রেয়াতের জন্য বিবেচিত হবে এবং সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে উচ্চ আয়ের করদাতারা আগের তুলনায় কম কর ছাড় পাবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের রাজস্ব আহরণের প্রয়োজনীয়তা এবং কর ছাড়ের সুযোগ সীমিত করার নীতির প্রতিফলন ঘটেছে এই সিদ্ধান্তে।
আগে রিটার্ন দিলে মিলবে পুরস্কার
তবে করদাতাদের জন্য একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তনও থাকছে। দীর্ঘদিন ধরে নভেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে আয়কর রিটার্ন দাখিলের চাপ তৈরি হতো। এবার সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পুরো বছরজুড়েই রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে।
শুধু তাই নয়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে বছরের শেষ দিকে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ফলে করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হবে।
কর সংস্কারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হানসহ বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ মনে করেন, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করার জন্য এসব সংস্কার প্রয়োজন। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে করদাতাদের হয়রানি, জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা দূর করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বিশেষ করে লাখো নতুন টিআইএনধারী ও রিটার্নদাতাকে সেবা দিতে না পারলে কর প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কর সংস্কারের নতুন যুগ
সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের করসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোকে শুধু কিছু নিয়ম পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত কর প্রশাসনের দর্শনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এখন থেকে শুধু আয় নয়, সম্পদ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, নির্বাচন, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং সম্পত্তির মালিকানার সঙ্গেও কর রিটার্ন সরাসরি যুক্ত হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার একদিকে রাজস্ব বাড়াতে চায়, অন্যদিকে অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আরও বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের ওপর—করদাতারা কি এটিকে স্বচ্ছ ও ন্যায্য ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করবেন, নাকি এটি তাদের কাছে নতুন প্রশাসনিক বোঝা হিসেবে বিবেচিত হবে? আগামী কয়েক বছরেই সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।