বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজিত ‘পূর্ণিমা তিথির সাধুমেলা’ ও ‘লালন দর্শন ও লালন সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা’ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে প্রতিবাদলিপি দিয়েছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে ‘সাধু-গুরু, ভক্ত-অনুরাগী ও নাগরিক সমাজ’-এর প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাছে দেওয়া ওই প্রতিবাদলিপিতে বর্তমান আয়োজনকে ‘লালন সাধনধারার বিকৃত উপস্থাপনা’ আখ্যা দিয়ে আট দফা দাবি জানানো হয়েছে।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, গত ২৯ জুন শিল্পকলা একাডেমিতে ‘পূর্ণিমা তিথির সাধুমেলা’ এবং ২৯ জুন থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী ‘লালন দর্শন ও লালন সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা’ আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু এ আয়োজনে লালন ফকিরের সাধনধারা, নদীয়ার ফকিরি ঐতিহ্য এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরাকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ তোলা হয়।
প্রতিবাদকারীরা বলেন, লালনকে কেবল লোকসংস্কৃতির প্রতীক বা ‘বাউল ব্র্যান্ড’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা তার ভাবধারা ও সাধনচর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের দাবি, লালনের নামে আয়োজিত কর্মসূচিতে প্রকৃত সাধু-গুরু, নদীয়ার পাঁচ ঘরের অনুসারী, আখড়াবাসী ও সাধন-সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়নি।
প্রতিবাদলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ‘সাধুমেলা’ নামে অনুষ্ঠান হলেও সেখানে প্রকৃত সাধু-গুরুদের অংশগ্রহণ নেই। একই সঙ্গে ‘লালন দর্শন ও লালন সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা’র প্রশিক্ষক নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তাদের ভাষ্য, প্রশিক্ষকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে লালনের গান, সুর ও ভাব বিকৃত করার অভিযোগ রয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, লালন ও সাধুসমাজ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা ও বিকৃত উপস্থাপনা সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি এর সুযোগ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্ব আরও সতর্কতার সঙ্গে পালন করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তারা।
প্রতিবাদকারীরা শিল্পকলা একাডেমির প্রচারপত্রে ব্যবহৃত ভিজ্যুয়াল নিয়েও আপত্তি জানান। তাদের দাবি, সেখানে এমন চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা লালন ধারার সাধুদের প্রতিনিধিত্ব করে না এবং এতে লালনের সাধনধারা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
প্রতিবাদলিপিতে আট দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— লালনের নামে ‘বিকৃতিকারীদের’ কার্যক্রম বন্ধ, সাধুমেলায় প্রকৃত সাধু-গুরু ও নদীয়ার পাঁচ ঘরের অনুসারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষক নির্বাচনের মানদণ্ড প্রকাশ, লালনবিষয়ক জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার দায়িত্ব লালন একাডেমির হাতে দেওয়া, সাধুসমাজের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা, প্রচারপত্রে বিভ্রান্তিকর প্রতীক ব্যবহার বন্ধ করা, শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর আমলের অনিয়ম ও দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং লালনকে ‘বাউল ব্র্যান্ড’ হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে তার ভাবধারা ও সাধনচর্চার মর্যাদা রক্ষায় নীতিগত অবস্থান গ্রহণ।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, লালনকে বিকৃত করা মানে বাংলার ভাবধারা বিকৃত করা এবং সাধু-গুরুদের বাদ দিয়ে সাধুমেলা আয়োজন করা সাধনাধারার প্রতি অসম্মান। তাই উত্থাপিত দাবিগুলোর বিষয়ে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের প্রতি।