হবিগঞ্জে পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হন এবং এনসিপি নেতারা কিছু সময় অবরুদ্ধ ছিলেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্থানীয় নেতাদের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ার জেরেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকালে হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল চত্বরে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে ও প্রশাসনের সমসাময়িক ভূমিকার পাশাপাশি তারেক রহমানের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন, যার ফলে এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য হুইপ জি কে গউছের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা চালিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা, এমনটি স্বীকার করেছেন দলের একাধিক নেতাকর্মী।
এনসিপি ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলম সকালে আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ‘জুলাই জাগরণ’ পদযাত্রায় অংশ নেন। পরে বানিয়াচংয়ে জুলাই শহীদদের কবর জিয়ারত করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হবিগঞ্জ শহরের টাউন হলের সামনে পথসভায় বক্তব্য দেন তারা। পরে সেখান থেকে সার্কিট হাউসে ফেরার পথে হামলার শিকার হন।
এনসিপির নেতারা জানান, আজমিরীগঞ্জ ও হবিগঞ্জের পথসভায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য হুইপ জি কে গউছের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ফেরার পথে হামলার ঘটনা ঘটে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘ওসমান হাদিসহ সব শহীদের হত্যার বিচার ও দেশ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাঠ ছাড়বো না। ১ হাজার ৪০০ শহীদের রক্তের ওপর পা রেখে তারেক রহমান দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নির্বাচনের আগে যাদের কাছ থেকে সরকার টাকা নিয়েছিল, এখন তাদের চাঁদাবাজির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। অসৎ ব্যক্তিদের বিভিন্ন পদে বসিয়ে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা রাতে মাদক ব্যবসা করে আর দিনে চাঁদাবাজি করে। যাদের প্রশ্রয় দিয়ে তারেক রহমান নিজের পায়েই কুড়াল মারছেন। দেশে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি চলতে দেওয়া হবে না। শেখ হাসিনার আমলে দেওয়া মিথ্যা মামলায় শুধু বিএনপি নেতাদের খালাস দেওয়া হচ্ছে, অন্যদের কারাগারে রাখা হচ্ছে।’
হামলার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা এনসিপি নেতাদের মাইক্রোবাস থামিয়ে চালককে মারধর করছেন। ভেতরে ছিলেন নেতারা। পরে তাদেরও নামিয়ে মারধর করা হয়। এ সময় ছবি তুলতে যাওয়া নাহিদ আহমেদ নামে এক সাংবাদিককে মারধর করেন তারা।
হামলার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ নেতাকর্মীরা সোনালী ব্যাংক হবিগঞ্জ প্রধান শাখার ভেতরে আশ্রয় নেন। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় আধাঘণ্টা পর হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদের নেতৃত্বে কয়েকশ’ পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়।
এ সময় একদিকে একদল লোক ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন। অন্যদিকে পুলিশের নিরাপত্তায় যাওয়ার সময় এনসিপির নেতাকর্মীরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ।
সারজিস আলম বলেন, ‘হুইপ জি কে গউছের ক্যাডার বাহিনী ও ছাত্রদলের ক্যাডাররা ন্যক্কারজনক এ হামলা চালিয়েছে। এতে এক কর্মীর একটি চোখ নষ্ট হয়েছে। মেয়র পদপ্রার্থী মুবিনের হাত ভেঙে গেছে। তিনি নিজেও হাতের আঙুলে আঘাত পেয়েছেন। এ ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা হবিগঞ্জ ছাড়বেন না।’
রাত ১০টা পর্যন্ত তারা সার্কিট হাউসে ছিলেন। এরপর পুলিশ পাহারায় তাদের মৌলভীবাজারে পাঠানো হয়েছে।
হামলার ঘটনার জন্য সারজিস আলম ছাত্রদল ও যুবদলকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে ফেরার পথে অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হবিগঞ্জে মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিএনপি, ছাত্রদল যুবদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করেন। স্থানীয় এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়েও সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা জড়ো হচ্ছিলেন। সমাবেশ থেকে ফেরার পথে হামলা চালান তারা।
এরপর শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সার্কিট হাউসের সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে জানিয়েছেন হবিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘হামলাকারীদের বিরত রাখতে একটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। রাত ১০টার দিকে এনসিপির নেতা সারজিস আলমকে পুলিশ পাহারায় মৌলভীবাজারে পাঠানো হয়েছে।’
হামলার বিষয়ে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান জানান, এনসিপি নেতারা বিএনপি ও দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অশ্লীল বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদ করায় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে তাদের ধাক্কাধাক্কি ও মারামারি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, ‘মূলত নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে দলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। পরে গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমরা নেতাকর্মীদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছি।’