বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎসগুলোর কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে গেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ভারত, জাপান, রাশিয়া এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) বাংলাদেশকে কোনও নতুন ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে সামগ্রিকভাবে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত বিদেশি ঋণ পরিস্থিতি সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে মোট ৪২২ কোটি ডলারের নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৫৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে অনেক উন্নয়ন সহযোগী নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন প্রবাহেও।
ভারতের অর্থায়নে স্থবিরতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের জন্য কোনও নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
ভারতের এক্সিম ব্যাংকের তিনটি লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৭৩৬ কোটি ডলারের অর্থায়ন সুবিধা পাচ্ছে। তবে নতুন প্রতিশ্রুতি না এলেও পুরোনো চুক্তির আওতায় অর্থ ছাড় অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-মে সময়ে ভারত ছাড় করেছে প্রায় ২৫ কোটি ডলার।
রূপপুরে অর্থ ছাড়, নতুন প্রতিশ্রুতি নেই
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে অর্থায়নকারী রাশিয়াও গত ১১ মাসে কোনো নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, এ সময়ে বাংলাদেশও নতুন কোনও প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয়নি।
তবে চলমান প্রকল্পের আওতায় রাশিয়া ৯৩ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে, যা এই সময়ে অন্যতম বড় অর্থ ছাড়ের ঘটনা।
জাপানের সঙ্গে আলোচনা চলমান
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার জাপানও নতুন কোনও ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি। যদিও বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-মে সময়ে জাপান আগের চুক্তির আওতায় ৪৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ছাড় করেছে।
এআইআইবির আগ্রহ কনসোর্টিয়াম ঋণে
এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) নতুন কোনও ঋণ প্রতিশ্রুতি না দিলেও ভবিষ্যতে যৌথ বা কনসোর্টিয়াম অর্থায়নে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও চীনের প্রতিশ্রুতি
বড় দাতাদের মধ্যে নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি এসেছে মূলত বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং চীনের কাছ থেকে। এসব সংস্থার অর্থায়নের কারণেই বৈদেশিক ঋণ প্রবাহ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েনি। তবে চারটি প্রধান উন্নয়ন সহযোগীর নতুন প্রতিশ্রুতি না থাকায় সামগ্রিক প্রতিশ্রুতির পরিমাণ কমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ঋণ পরিশোধে নতুন রেকর্ড
বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ঋণদাতা দেশ ও সংস্থার কাছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে একক অর্থবছরের একই সময়ে সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ।
অন্যদিকে একই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৪৫৮ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি— দুই প্রবণতাই বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধরে রাখতে হলে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নতুন অর্থায়ন চুক্তি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।