রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজালের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১২টি অভিযোগের শুনানি শেষে সংগঠনটির আসন্ন বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পূর্বে ভূমি দখল, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও ঋণখেলাপির মতো বিস্তর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি রিহ্যাবের নেতৃত্বে আসেন। সংশ্লিষ্টরা তাকে আবাসন খাত দখলের কারিগর বলে উল্লেখ করেছেন। শুনানির পর তার অতীতের এসব অপকর্ম ফের আলোচনায় এসেছে।
জানা গেছে, রিহ্যাবের সহসভাপতি-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাসসহ পরিচালনা পর্ষদের ১০ জন সদস্যের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ড. আলী আফজালের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো— গত ২২ জুলাই পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই রিহ্যাবের তহবিল থেকে সভাপতি ড. আলী আফজাল ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুর রাজ্জাকের যৌথ স্বাক্ষরে ২ কোটি টাকা উত্তোলন করে অবৈধভাবে ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়া গত তিন মাসে পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই তহবিল থেকে আরও ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া সংগঠনের গঠনতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে পর্ষদ সদস্যদের সুযোগ না দিয়ে নিজেদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে স্ট্যান্ডিং কমিটিতে নিয়োগ, কর্মী নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতিতে স্বেচ্ছাচারিতা, গোপনীয় তথ্য প্রকাশ, চার দিনের আবাসন মেলা (সামার ফেয়ার-২০২৬) ও এজিএম আয়োজন নিয়ে অস্বচ্ছতাসহ ১২টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় মন্ত্রণালয় অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল।
শুনানি শেষে রিহ্যাবের আসন্ন বার্ষিক সাধারণ সভা ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। রিহ্যাবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১২টি অভিযোগের বিষয়ে শুনানি শেষে অভিযোগগুলোর অধিকতর পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া আলী আফজাল টাকার বিনিময়ে নিজস্ব বাহিনী লালন-পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মহলে অবৈধ সুবিধা আদায় করতে তিনি ভুয়া প্লট উপঢৌকন হিসেবে দিয়ে থাকেন। তার বিরুদ্ধে জাল দলিলে বন বিভাগের জমি এবং সাভার এলাকায় সাধারণ মানুষের জমি দখলেরও বিস্তর অভিযোগ আছে। জমি দখলে বাধা দিলে তিনি তার বাহিনী দিয়ে স্থানীয়দের ওপর নির্যাতন চালাতেন। ২০২১ সালে কালিয়াকৈর রেঞ্জ অফিসার শহীদুল আলম তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন।
অভিযোগ আছে, আলী আফজাল ২০২১ সালে ‘কৃষিবিদ ফিড’-এর ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করে শত কোটি টাকা লুটপাট করেন। আটটি ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তিনি ঋণখেলাপি। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাবেক কর্মকর্তার সাহায্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ তিনি পুনঃতফসিল করান। অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রভাব খাটিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধাও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাখাতেও ড. আলী আফজালের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতন আটকে রাখা, প্রশাসনিক হয়রানি এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ড. আলী আফজালের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো খোঁজখবর নিচ্ছে এবং তদন্ত শুরু করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না; আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ড. আলী আফজালের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।