শরীর সুস্থ রাখতে খাবারের দিকে নজর দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ অন্ত্রের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। হজমপ্রক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থেকে শুরু করে সামগ্রিক সুস্থতার নানা দিকের সঙ্গে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে। আমরা প্রতিদিন কী ধরনের খাবার খাচ্ছি, তার ওপর অন্ত্রের কার্যকারিতাও অনেকটাই নির্ভর করে।
তবে খাবার বাছাইয়ের সময় অনেকেই শুধু স্বাদ বা পছন্দকে গুরুত্ব দেন। খাবারটি অন্ত্রের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা সবসময় বিবেচনায় আসে না। খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এনে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে চাইলে পুষ্টিবিদ দীপশিখা জৈনের কিছু পরামর্শ কাজে লাগতে পারে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করে তিনি তিন সপ্তাহের একটি খাদ্যাভ্যাসের কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই সময়ের মধ্যে খাবারের ধরন ও অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন এনে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া যেতে পারে। তবে এটি কোনো চিকিৎসা-পদ্ধতি নয় এবং সবার শরীরের জন্য একই ধরনের খাদ্যাভ্যাস উপযোগী নাও হতে পারে।
প্রথম সপ্তাহে হালকা রাখুন খাদ্যতালিকা
প্রথম সপ্তাহে পুষ্টিবিদ কম ফডম্যাপ বা লো-ফডম্যাপ ধরনের খাদ্য পরিকল্পনা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। ফডম্যাপ বলতে এমন কিছু শর্করাকে বোঝায়, যা অনেকের ক্ষেত্রে সহজে হজম হয় না এবং অন্ত্রে গাঁজনের মাধ্যমে গ্যাস ও পেট ফাঁপার মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, প্রথম সপ্তাহে গ্লুটেন, ডালজাতীয় খাবার, সরবিটল, চিনি এবং কিছু আঁশযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। তবে এখানে মনে রাখা জরুরি, সব ধরনের আঁশ বা শর্করা সবার জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং সুস্থ মানুষের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আঁশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই লো-ফডম্যাপ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
দ্বিতীয় সপ্তাহে অন্ত্রের আবরণের যত্ন
দ্বিতীয় সপ্তাহে অন্ত্রের ভেতরের আবরণ বা সুরক্ষামূলক স্তরের যত্ন নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পুষ্টিবিদ। এ সময় অলিভ অয়েল, হলুদে থাকা কারকিউমিন, ঘি, আপেল এবং ভাত বা চাল দিয়ে তৈরি খাবার খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তাঁর মতে, এসব খাবারের কিছু উপাদান অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে কারকিউমিনের প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে কোনও একটি খাবার সরাসরি অন্ত্রের আবরণ ‘শক্তিশালী’ করে এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
তৃতীয় সপ্তাহে উপকারী জীবাণুর দিকে নজর
তৃতীয় সপ্তাহে অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রিবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
কলা, মাশরুম, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, কোকো, অ্যাসপারাগাস, রসুন এবং তিসির বীজের মতো খাবারে থাকা বিভিন্ন উপাদান অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। এসব খাবার অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি বা মাইক্রোবায়োমের জন্য উপকারী হতে পারে।
এর পাশাপাশি প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদ। কেফির, সাওয়ারডো রুটি, নারকেলের দই, সাওয়ারক্রাউট, টক আচার এবং টেম্পের মতো খাবারে উপকারী জীবাণু থাকতে পারে। তবে সব ধরনের আচার বা গাঁজানো খাবারে একই ধরনের উপকারী জীবাণু থাকে না। তাই খাবারের মান ও প্রস্তুত প্রক্রিয়ার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু তিন সপ্তাহের কোনও নির্দিষ্ট খাদ্য পরিকল্পনার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদে সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়াও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কারও যদি দীর্ঘদিন পেট ফাঁপা, পেটব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা হজমের অন্য কোনও সমস্যা থাকে, তাহলে নিজের মতো করে কঠোর খাদ্যাভ্যাস শুরু না করে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য ও পরামর্শ শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
সূত্র: এনডিটিভি