দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনো ধরনের বাতরোগে ভুগছেন। তাদের মধ্যে প্রায় চারজনে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। একইভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী বছরের কোনো না কোনো সময়ে কাজ করার সক্ষমতাও হারাচ্ছেন। চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি খরচ এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর।
শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘১০ম রোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও ১ম বৈজ্ঞানিক সম্মেলন’-এ এসব তথ্য তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান এবং শমরিতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস।
২০১৫ সালের জাতীয় পর্যায়ের মাসকুলোস্কেলিটাল গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের বাতরোগে আক্রান্ত। আক্রান্তদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। আর ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বছরের কোনো না কোনো সময়ে কাজের সক্ষমতা হারান।
এর আগে পরিচালিত আঞ্চলিক কোপকর্ড জরিপেও দেশের ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের হাড় ও পেশির ব্যথায় ভোগার তথ্য পাওয়া যায়।
ডা. নীরা ফেরদৌস বলেন, ‘বাতরোগের কারণে শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপেও পড়তে হচ্ছে। রোগের ধরন ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে বছরে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।’
সম্মেলনে জানানো হয়, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় বছরে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যয় হতে পারে ৪০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া হাঁটু প্রতিস্থাপনে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা এবং হিপ ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গুত্ব তৈরি করতে পারে এমন বাতরোগ এখনো অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত জাতীয় নীতিতে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞের সংখ্যা খুবই সীমিত। এ কারণে অনেক রোগী সময়মতো রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না।
পিএনআরএফআর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বাতব্যথা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অনেক বাতের রোগী স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। এতে কর্মক্ষম মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো বাতরোগও দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যথেচ্ছ ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।’
সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক জীবন, সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, যথাসময়ে টিকা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি বাতরোগীদের চিকিৎসায় সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বড় পরিসরে বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
দিনব্যাপী রোগী শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের কাউন্সিলর ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদ হোসেন প্রমুখ।