স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আলোচনায় এখন প্রায়ই শোনা যায়—সপ্তাহে অন্তত ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়া উচিত। তবে এই দাবির পেছনে আসলেই কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। ক্রমবর্ধমান সাপ্লিমেন্টের বাজার হয়তো এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু একটি সত্যিকারের স্বাস্থ্যকর অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম (Gut Microbiome) দেখতে কেমন হওয়া উচিত, তা বিজ্ঞানীরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে জানেন না।
‘সপ্তাহে ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার’ এই ধারণার সূত্রপাত ২০১৮ সালের একটি গবেষণা থেকে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার ১০ হাজারের বেশি মানুষকে নিয়ে করা ওই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের মলের নমুনা জমা দেন এবং সাধারণত তারা কী ধরনের খাবার খান, সে সম্পর্কেও তথ্য জানান।
গবেষকরা নমুনাগুলোতে থাকা অণুজীব বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, যারা সপ্তাহে ৩০টির বেশি ভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খেতেন, তাদের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম যারা ১০টির কম ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খেতেন, তাদের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময় ছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ‘৩০’ সংখ্যাটিই স্বাস্থ্যের জন্য কোনও নির্দিষ্ট বা জাদুকরী সীমা। অনেকে মনে করেন- সপ্তাহে ২৫ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খান নাকি ৩০ ধরনের খাবার তা এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের লাইফ সায়েন্স বিভাগের প্রধান এবং ‘ইমিউন হেলথ: আ মিথ-বাস্টিং গাইড’ বইয়ের লেখক অধ্যাপক ড্যানিয়েল এম ডেভিস বলেন, “৩০ সংখ্যাটি অনেকটাই ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা হয়েছে। এমন নয় যে গবেষকরা ১০, ২০, ৩০ বা ৩৫ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ার বিষয়টি তুলনা করে কোনও নির্দিষ্ট সীমারেখা খুঁজে পেয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, সপ্তাহে ৩০টির বেশি ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়া মানুষরা সম্ভবত শুধু খাবারের ক্ষেত্রেই নয়, জীবনযাপনের আরও অনেক বিষয়েও আলাদা অভ্যাস অনুসরণ করেন।
এই গবেষণা এটিও প্রমাণ করে না যে, সপ্তাহে ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খেলেই সরাসরি স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। অধ্যাপক ডেভিসের মতে, বৈচিত্র্যময় মাইক্রোবায়োমের সঙ্গে কিছু রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, বিজ্ঞানীরা এখনও জানেন না একটি ‘স্বাস্থ্যকর’ মাইক্রোবায়োমের সঠিক বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচিত।
ডেভিস বলেন, “সপ্তাহে ৩০টির বেশি ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়া মানুষরা সম্ভবত আরও অসংখ্য বিষয়েও ভিন্ন জীবনযাপন করেন।”
তার মতে, শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ—এসব বিষয়ও অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে প্রভাবিত করে। কিন্তু মানুষের জটিল জীবনযাত্রার কারণে, এর মধ্যে কোন বিষয়টি ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে, তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
ডেভিস সতর্ক করে বলছেন, ‘সপ্তাহে ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার’ ধারণাটিকে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে এমন অনেক ব্যয়বহুল সাপ্লিমেন্ট বাজারে এসেছে, যেগুলো দাবি করে—এসব পণ্য গ্রহণ করলেই সহজে ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবারের লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব। তবে এসব সাপ্লিমেন্ট কার্যকর কি না, তার পক্ষে স্বাধীন গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ খুবই সীমিত।
ড্যানিয়েল ডেভিস বলেন, “সপ্তাহে ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খেলেই রোগ প্রতিরোধ হবে বা নির্দিষ্ট কোনও স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যাবে—এমন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে আমরা জানি, বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, ডালজাতীয় খাবার, বাদাম এবং পূর্ণ শস্য খাওয়া সাধারণভাবে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।”
তথ্যসূত্র: ২০১৮ সালের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বিষয়ক গবেষণা, অধ্যাপক ড্যানিয়েল এম ডেভিসের বক্তব্য, ‘ইমিউন হেলথ: আ মিথ-বাস্টিং গাইড’ বইয়ের তথ্য।