সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিতে হামলা, বাধা প্রদান ও মারধরের ঘটনায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। প্রথম দিন ২৮ জুলাই হবিগঞ্জ সার্কিট হাউজের সামনে জুলাই পদযাত্রায় বক্তব্য চলাকালে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ কমপক্ষে ১০ নেতাকর্মী আহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ২৯ জুলাই দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেয় দলটি। এদিন হবিগঞ্জে কর্মসূচিতে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন।
সেখানে যোগ দিতে ঢাকা থেকে রওনা হন দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তবে এরই মধ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করতেই পুলিশের বাধার মুখে পড়েন তারা। উপজেলার সাতগাঁও এলাকায় ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে ট্রাক ফেলে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ।
তখন সেখানেই বসে পড়েন নাহিদ ও হাসনাতসহ শীর্ষ নেতারা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ান তারা। একপর্যায়ে হবিগঞ্জে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া এলাকায় পৌঁছাতেই তাদের পথরোধ করে পুলিশ।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে সিলেটের গোলাপগঞ্জে সারজিস আলমের গাড়ি ভাঙচুর ও নেতাকর্মীদের মারধর করা হয়। টানা তিন দিনের এমন পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল-যুবদল ও প্রশাসনকে দায়ী করে বক্তব্য রেখেছেন এনসিপি নেতারা।
৩০ জুলাই সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘‘বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে রাস্তা ঘেরাও করে রাখা শেখ হাসিনার কপি।’’ কপি করে নয়, আন্দোলন দমনে নতুন কৌশল নিয়ে হাজির হতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এর আগ ২৯ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেয় এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে এনসিপি নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার জুলাইয়ের চেতনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাই অতীতের মতো ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে। যদিও সশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ—এনসিপি নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে অশোভনীয় বক্তব্য দিয়েছেন। তাই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এনসিপির প্রতি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির এমন মারমুখী আচরণ নিয়ে অনেকে অনেকভাবে বিশ্লেষণ করছেন। কেউ বলছেন, কথার জবাব কথা দিয়ে দিতে হবে। আবার এনসিপিকেও আরও সংযত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। জুলাইয়ের নেতৃত্বের প্রতি ক্ষমতাসীনদের এমন কঠোরতাকে ভিন্নভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতকে অপাংক্তেয় করে এনসিপিকে লাইমলাইটে আনার কোনও প্রচেষ্টা নাকি তাদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ, সে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কে কার ওপর হামলা করেছে সেটা বলা কঠিন। তবে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ সঠিক হলে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ এনসিপি জুলাইয়ের শক্তি। এক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষায় সরকারেরও দায় আছে। এটাও ঠিক, ধারাবাহিক হামলার শিকার হলে প্রধান বিরোধী দলের পরিবর্তে তারা লাইমলাইটে চলে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’’
তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে কিনা জানতে চালে তিনি বলেন, ‘‘সেটি এখনও বলার সময় হয়নি।’’ তবে তিনি উভয়পক্ষকেই সংযত হওয়ার পরামর্শ দেন।
কেন এমন পরিস্থিতি, আড়ালে অন্য কিছু?
বিপরীত মেরুর রাজনীতি করলেও বিএনপি ও এনসিপি উভয়পক্ষ জুলাইয়ের পক্ষের দল। আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা ছিল। এ কারণে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একপক্ষ কোথাও হামলার শিকার হলে অন্যপক্ষ প্রতিবাদ জানিয়েছে। রাজপথে একসঙ্গে কর্মসূচি পালন করেছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে এনসিপি। এতে নতুন দল হিসেবে তারা সংসদে উল্লেখযোগ্য আসনও পায়। সংসদেও দলটির তরুণ নেতারা সমসাময়িক বিষয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করছেন। কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রধান বিরোধী দল জামায়াতকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। এদিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে নিয়ে সরকারের ভেতরেও এক ধরনের উষ্মা আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির শরিক দলের এক শীর্ষ নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতকে অপাংক্তেয় করার চেষ্টা করবে সরকার। সে অনুযায়ী কৌশলে এনসিপির ওপর হামলা করে তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার চেষ্টা হচ্ছে।’’
তবে এ ধরনের মূল্যায়নকে একেবারেই অমূলক ও মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মিডিয়া সেলের প্রধান মাহবুবুল আলম।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দুর্ভাগ্য চব্বিশের জুলাইয়ে আমরা দেখেছি—ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর হাসিনা-বাহিনী হামলা করেছে। এর এখন দেখছি তারেক-বাহিনী একই আচরণ করছে। আর সেই হামলাকে জায়েজ করতে নানা ধরনের গল্প সাজানো হচ্ছে।’’
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ফ্যাসিবাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এগোচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রথমে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। এখন একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে এনসিপিকে টার্গেট করা হচ্ছে। তাই একটি হামলারও বিচার করেনি। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘‘এর জন্য সরকারকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে।’’
রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়েই দেওয়া উচিত
গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনে পদযাত্রা শেষে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির(এনসিপি) শীর্ষ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সার্জিস আলম। এ সময় নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা করে একদল যুবক। এতে পাটওয়ারী ও সারজিসসহ কমপক্ষে ১০ নেতাকর্মী আহত হন। এর মধ্যে আলিফ চৌধুরী নামে নবীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশক্তির এক নেতা আহত হন। ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন তিনি। তার একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান দলটির নেতারা।
হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দায়ী করেন এনসিপি নেতারা। আর সরাসরি অস্বীকার না করলেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার জন্য এনসিপি নেতাদের অসংলগ্ন বক্তব্যকে দায়ী করে বিএনপি। তারা অভিযোগ করেন, সমাবেশ থেকে তারেক রহমান ও হবিগঞ্জের বিএনপির দলীয় এমপি জিকে গউছকে নিয়ে অশোভনীয় বক্তব্য দিয়েছেন এনসিপি নেতারা। যা হবিগঞ্জের সাধারণ মানুষ মানতে পারেননি।
দুপক্ষের এমন দায় চাপানোর মধ্যেই ২৯ ও ৩০ জুলাই সিলেট অঞ্চলে আরও দু’দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়েই দেওয়া উচিত বলে মনে করেন রাজনীতিবিদরা। এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না বলে মনে করেন তারা। কারণ এতে সহিংসতা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে বলে তাদের ধারণা।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় ক্ষমতাসীন দলের হামলা উদ্বেগজনক। সেখানে হামলার প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে বাধা দিয়েছে—যা মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি। তিন দিনে এসব ঘটনার যেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, তা খুবই আশঙ্কাজনক।’’ তিনি প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব কথা দিয়েই দেওয়ার আহ্বান জানান।
একই মন্তব্য করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি মনে করেন, কোনও রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যে আপত্তি থাকলে, ভিন্নভাবেও প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু হামলা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’’ তিনি এনসিপির কর্মসূচিতে হামলার নিন্দা জানান।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘‘আমরা চাই, দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক। রাজনৈতিক দল মত প্রকাশ করবে, এতে আপত্তি নেই। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, মত প্রকাশেরও তো একটা সভ্য মান থাকা উচিত’, নয়াপল্টনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন মনোভাব ব্যক্ত করেন।
বিএনপি ও জামায়াতের ভিন্ন ব্যাখ্যা
হবিগঞ্জে এনসিপির হামলাকে ফ্যাসিবাদের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘সরকার মুখে মত প্রকাশের কথা বললেও তারা ভিন্নমতকে সহ্য করতে চায় না। এনসিপির কর্মসূচিতে হামলা তার প্রমাণ।’’ তিনি জানান, এ ঘটনা নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক হবে।
অপরদিকে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি কোনও হামলাকেই সমর্থন করে না। আমাদের দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবসময় সহনশীলতার রাজনীতির কথা বলে আসছেন। তারপরও হবিগঞ্জের ঘটনায় কারা জড়িত, নিশ্চয়ই বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন দেখবে।’’