ঢাকাSaturday , 12 September 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতায় পরাবাস্তবতার শৈল্পিক রূপায়ণ

UttorbongoBD
August 3, 2026 3:55 pm
Link Copied!


মনে আছে তিনটি স্তর—চেতন, অবচেতন আর অচেতন। স্যুরলিয়স্টিক কবিরা জেগেও স্বপ্ন দেখেন। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নলোকে চলে যান। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘real and unreal, meditation and action’ মিশে একাকার হয়ে যায়। যা যুক্তিগ্রাহ্যও নয় আবার বিশ্বাসযোগ্যও নয়। অথচ মনকে দুর্নিবার আকর্ষণ করে টেনে নেয়। স্বপ্ন স্বপ্নের সঙ্গে মিশে যায়। এ অবস্থাকে পরাবাস্তব বা সুররিয়ালিস্ট বলে। কল্পনায় যখন সীমা ছেড়ে যায় তখন জন্ম হয় পরাবাস্তব চিত্রকল্পের। অবচেতন মনের কল্পনা থেকেই সৃষ্টি হয় পরাবাস্তব চিত্রকল্প। পরাবাস্তববাদী কবিতা হলো এক প্রকার লেখনী শৈলী, যা যুক্তিকে পাশ কাটাতে স্বপ্নবৎ ও অযৌক্তিক চিত্রকল্প ব্যবহার করে। এর সূচনা হয়েছিল ১৯২০-এর দশকে প্যারিসে। 

ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রেতোঁ পরাবাস্তবকে বিশ্বকবিতায় পরিচয় ঘটিয়ে জনপ্রিয় করে তোলেন। এটি করতে তিনি শিল্প আন্দোলন হিসাবে দাঁড় করান। ১৯২৫ সালে ‘ম্যানিফেস্ত দ্যু সুররিয়ালিজম’ ইশতাহার প্রকাশ ও প্রচার করেন। পরাবাস্তবতার সঙ্গে রোমান্টিকতার অনেক মিল রয়েছে। ১৯৬৩ সালের জুন মাসে লন্ডনে আন্তর্জাতিক পরাবাস্তবতার প্রদর্শনীর চিত্রতালিকায় ভূমিকায় লিখলেন, সাধারণ অর্থে পরাবাস্তব শিল্প রোমান্টিক নীতির অন্য নাম। পরবর্তীতে পরাবাস্তব আন্দোলন দুর্বল হয়ে যায় সাহিত্যিক ও শিল্পীদের নিষ্ক্রিয়তায়। তারপরেও এ আন্দোলনের প্রভাব চলতে থাকে। আঁদ্রে ব্রেতোঁ তার বিখ্যাত কবিতা “ফ্রি ইউনিয়ন”-এ ভালোবাসার তীব্রতা বোঝাতে প্রাণবন্ত ও অবাস্তবধর্মী প্রাণী ও প্রকৃতির চিত্রকল্প ব্যবহার করা হয়েছে। পল এলুয়ার স্বপ্নবৎ, কোমল এবং অত্যন্ত দৃশ্যমান বা চিত্রধর্মী কবিতার জন্য তিনি পরিচিত। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা তার অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অস্বস্তিকর অবাস্তববাদী রচনার জন্য বিখ্যাত; যেমন— “ডন” কবিতায় প্রলয়ংকরী বা মহাপ্রলয়-সদৃশ চমকপ্রদ চিত্রকল্পের ব্যবহার দেখা যায়। গিয়ম আপোলিনেয়ার পরাবাস্তব বা ‘অবাস্তববাদী’ পরিভাষাটি প্রবর্তনের কৃতিত্ব তার। বাংলা কবিতায় তিরিশের কবিতায় ধরা দেয় এ আন্দোলনের প্রভাব। বিষ্ণু দে-এর কিছু কবিতায় পরাবাস্তবতার উপাদান লক্ষ্য করা যায়। জীবনানন্দ দাশের পথ ধরে কাব্যসাহিত্যে প্রথম ব্যাপকভাবে পরাবাস্তব অনুষঙ্গের কবিতা লেখেন শামসুর রাহমান। তার আগে আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান চেষ্টা করেছেন। তাদের সে উদ্যোগ চেষ্টার পর্যায়েই ছিল। তবে জীবনানন্দকে আলোকবর্তিকা হিসেবে এবং পরে প্রভাবমুক্ত হয়ে বিস্তৃত পরিসরে শামসুর রাহমান কবিতায় পরাবাস্তব উপাদানের কবিতা লেখেন। তার এ উদ্যোগ যথেষ্ট সফল। পরবর্তীতে আব্দুল মান্নান সৈয়দ এ ধারার সফল প্রয়োগ করেন। বাংলাকাব্যে প্রথম খাঁটি স্যুররিয়ালিস্ট কবি হচ্ছেন জীবনানন্দ দাশ। কোনো-কোনো কবিতায় অবচেতন মনে কথা বলেছেন তিনি। তার কবিতায় ‘হিরের প্রদীপ জ্বেলে শেফালিকা বোস হাসে’, অথবা ‘স্বপ্নের ভিতরে হরিণেরা খেলা করে’। ‘শিকার’ কবিতায় স্যুয়ালিস্টিকের রঙে আকাশের রং হয় ঘাসফড়িঙের মতো। পরাবাস্তবতার উপাদান রয়েছে এমন কবিতা নাবিক, হাঁস, মহিলা, গোধূলি সন্ধির নৃত্য (সাতটি তারার তিমির), রাত্রি এবং জয়জয়ন্তীর সূর্য, সময়ের তীরে, (বেলা অবেলা কালবেলা), শিকার, হরিণেরা, নগ্ননির্জন হাত, বেড়াল, (বনলতা সেন), নিরালোক, পরিচায়ক, শ্রাবণ রাত, শব, স্বপ্ন, আজকের একমুহূর্ত, (মহাপৃথিবী) কবিতায়। অন্যান্য কিছু কিছু কবিতায় হালকাভাবে এ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।

আব্দুল মান্নান সৈয়দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭)। প্রথম গ্রন্থেই সৈয়দের শিল্প ও কাব্যভাবনায় শৈল্পিকতা লক্ষ্য করা যায়। এখান থেকেই তার স্বপ্নময় ফ্যান্টাসির জগতে ভ্রমণ। মানে পরাবাস্তব কবিতার শুরু। এরপরে জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা (১৯৬৯), সংবেদন ও জলতরঙ্গ (১৯৭৪), পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮২), কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২), মাছ সিরিজ (১৯৮৪) প্রভৃতি কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় চলমান থাকে। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে পরাবাস্তব শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। কবিতা কী তাই এখনো ঠিক করতে পারেনি। কুয়াশায় মোড়ানো একটি বিষয় হচ্ছে কবিতা। পরাবাস্তব কবিতা তো আরো কুয়াশার চাদরে মোড়ানো বিষয়াদি লুকিয়ে থাকে। মান্নান সৈয়দের কল্পময় ভ্রমণে স্বপ্নের ব্যাকরণ প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তার চেতনায় রাত্রি, পুলিশ, বাড়ি, দোকান, ভৌতিক আবহের রাত্রি কিংবা এমন অনুষঙ্গ, ভূত ইত্যাদি ঘুরে ফিরে এসেছে। তার কবিতা মূলত উপমা, প্রতীক, রূপক ও চিত্রপ্রধান। প্রায়ই এসেছে রাত্রি কিংবা ভৌতিক আবহের অনুষঙ্গ। কিছু উদাহরণ:

(১) ‘আমি ভূতের মতো উল্টা-পায়ে পুরোনো এই বাড়িতে উঠছি, নামছি, চাবিহীন হাসছি—কতদিন আমি কাঁদিনি, মনে হলো: আমার একটি মাত্র কান্নার ফোঁর উপর বিবাঁ একটি জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে, নোঙর নেমে গেছে মাটি ভেদ করে পাতালের দিকে, মাল্লারা দড়িদড়া ছুঁড়ে দিচ্ছে চারদিক থেকে’ (পাগলা এই রাত্রিরা)

(২) ‘জ্যোৎস্না কী?—না, জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের মতো চুলহীন জলবায়ুহীন মুন্ডু, জোড়া-জোড়া চোখ, সাতটি আঙুরের একমুষ্টি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার, একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিৎকার’ (জ্যোৎস্না)

(৩) ‘এই সন্ধ্যে, মৌমাছির মতো ব্যস্ত শহর, যেন কোনো মহাকাব্য জ্যান্ত হয়ে উঠেছে: জানালার পাহাড় হয়ে উঠেছে আমার শরীর, শরীরের মধ্যে সন্ধ্যের দোকান—কী ভিড়ের চাপ! পশ্চিম সীমা টেনে দিলে তুমি, সন্ধ্যে পড়েছে, তবু আমাদের বাড়ির বাইরে তেতো রাত, আমাদের বাড়ির বাইরে সেতুর ব্যান্ডেজ করা রাত, মেয়ে-মানুষ রাত, পশ্চিমে, ছাড়া পেয়ে ডাকাত নেমে পড়ল ঘোড়ার ক্লিপক্লাপ ভিজে মাঠে, লেনে-বাইলেনে’ (সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল/কবিতা সমগ্র, ২০০২))

(৪) ‘কালো দড়ির ভিতরকার ফেটে পড়া হাসির মতো সরোবর থেকে লাল-লীল-সবুজ মাছ তাকে জেনো আমার যৌবন-কাঁচের ভিতরে জলে আঁশ ঝেড়ে ফেলে জ্বলতে-জ্বলতে চলে যায় তৎপর মাছের ঝাঁক’ (জীবন আমার বোন)

‘চুলহীন জলবায়ুহীন মুন্ডু’, ‘জল্লাদের ডিম’ বস্তুর লজিকহীন জ্যোৎস্নার আবহ কবিতায় নতুন ও পরাবাস্তবতার ধারণার জন্ম দেয়। তিনি পৃথিবীকে পরাপৃথিবী, গ্রামকে পরাগ্রাম কিংবা শহরকে পরানগর রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব পরানগরে তিনটি স্তনের মেয়েমানুষ, বিভিন্ন রকমের রাত্রি কিংবা জ্যোৎস্না, ‘সবুজ মশাল জ্বেলে নিসর্গ খেলছে তলোয়ার (দুপুরবেলার প্রকল্পনা), ফেরেশতা, নক্ষত্র, বেশ্যা, ঘোড়া ইত্যাদি ভৌতিক ও অচেনা চেতনার বসবাস। ষাটের দশকের শহীদ কাদরী কিংবা রফিক আজাদসহ অন্যান্য কবির কবিতায় নাগরিক চিত্র ফুটে উঠেছে। মান্নানের কবিতায় নাগরিক জীবনের ক্ষয়িষ্ণু অংশ জোরালো হয়েছে। তার কবিতায় নাগরিক বীভৎসতার চিত্রও আছে। যেমন:

‘কী চড়া বাজার! আমাদের পাশের লোকটির সত্যি-সত্যি গলা কেটে নিল চীনে প্লেটের উপর এক গাঢ় দোকানদার। এরকম প্রমাণ আমি কখনো দেখিনি। তারপর করল কি?—না, তার কাটা-মুণ্ডু ঝুলিয়ে দিল দোকানের উইন্ডোর নিচে বিজ্ঞাপনে টপটপ’ (সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল)

মান্নান সৈয়দের কবিতায় আছে রঙের বহুবর্ণিল বিচ্ছুরণ। মনের বিভিন্ন রং দিয়ে ভ্রমণ করেছেন কবিতায়। তুলির আঁচড়ে নির্মাণ করেছেন বাংলা কবিতায় নতুন কিন্তু বৃহত্তর এক জগৎ। সে জগতের এখন পর্যন্ত বড়ো অংশের মালিক তিনি। বলছি, পরাবাস্তবতার কথা। কবিতার তার রূপ-বর্ণ ও তার রূপান্তর হয়েছে গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তাচেতনার। আবার ধূসর বিবর্ণতায়ও ধরা দিয়েছে মান্নানের কবিতায়। নিস্তব্ধতার মধ্যে ভৌতিক আবহের জগৎ। প্রচলিত রংকে ভেঙেচুরে অধিক উজ্জ্বল করেছে শৈল্পিক সত্তাগুলোকে। পরাবাস্তবতায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভট, কাল্পনিক, ভৌতিক আবহ নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে বৃহত্তর পরাবাস্তব জগৎ। বাংলা কবিতায় এখনো তিনি অগ্রগামী পথিক। সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন বস্তুকে পাশাপাশি রেখে চমকপ্রদ ও স্বপ্নবৎ রূপক সৃষ্টি করা পরাবাস্তব কবিতার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। ‘পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ’ কবিতায় পরাবাস্তবতার তীব্র উপাদান দেখতে পাই। পাঁচটি মাছ ঝরনা থেকে নেমে চারটি পৃথক নদীতে এবং অন্যটি অভিসারে গেছে। তারপর সমুদ্রে একাকী চলছে। এ অবাস্তবতার পরিচিত্র এমন পরিচিত্র মান্নান সৈয়দের অনেক কবিতা জুড়েই রয়েছে।

‘পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ ঝরনা থেকে নেমে এসেছিল।
এখন, রহস্যময় জলে, খেলা করে অবিরল।
পদ্মায় গিয়েছে একটি—মেঘনায়-যমুনায়-সুরমায়—
আর-একটি গোপন ইচ্ছায়। পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ
ঝরনা থেকে নেমে এসে সাঁতরে চলে বিভিন্ন নদীতে।
পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ জলের রহস্য ভেদ কর
এখন একাকী এক শব্দহীন সমুদ্রে চলেছে’

কোনো কাহিনিকে খণ্ডিত করে প্রকাশ পরাবাস্তব কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে কবিতার মূল বক্তব্য বা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পাঠক কুয়াশায় থাকেন কিংবা বিভ্রান্ত হতে পারেন। অনেক সময়-এ কবিতার কোনো সুদৃঢ় কেন্দ্রীয় আখ্যান থাকে না। কবিতার অগ্রগমন ঘটে অনুষঙ্গ বা স্বগতোক্তির ধাঁচে। সৈয়দ মান্নানের কবিতা পড়লে এ ধারণার ভিত্তি সুদৃঢ় হবে।
‘দেখছি ঘাসের মেজে ছিন্ন, লাল মুণ্ডু নিয়ে খেলে বিনা পায়ে, বিনা অপব্যয়ে: সূর্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে কালো রেলগাড়ি…’ ( রাত্রিপাত-আবদুল মান্নান সৈয়দ)

পরাবাস্তবতার জগতে প্রবেশ করাটা এক ধরনের মুক্তি দেয়। কবিতার নিয়মকানুন আর বাস্তব জীবনের নিয়মকানুন এক নয়। পরাবাস্তব কবিতায় আমরা অন্য কোনো জগতে, মহাশূন্যে ভেসে বেড়াই। আমরা তখন কবির মনোজগতে, কোনো অজানায় কিংবা ইথারের মতো কোনো অতীন্দ্রিয় স্থানে অবস্থান করি। অথবা হয়তো আমরা ঘরের ভেতরেই আছি, কিন্তু চারপাশের হিসাব-নিকাশ বা যুক্তিগুলো যেন আর মিলছে না। যুক্তিতর্ক, আইন, সমাজ কিংবা রসায়ন-পদার্থবিজ্ঞানের নেক নিয়মকানুন মানুষের জীবন দাঁড়িয়ে দিতে পারে, অনেককিছুকেই সীমাবদ্ধ করতে পারে, কিন্তু কবিতা দিয়ে কোনোকিছুই সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। কবিতায় কল্পনাকে মুক্ত বিহঙ্গের মতো পাখা মেলতে দিতে হয়। পরাবাস্তবতা কবিতার ক্ষেত্রে এ স্বাধীনতা অনেক বেশি, মনে হয় কল্পনার বাইরেও। ভূত কালো, রহস্যময় ও অশরীরী। কিন্তু সৈয়দ মান্নানের কবিতায় ভূত জ্যোৎস্নার মতো : 

‘জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরজায়, সব দরজায়, আমার চারদিকে যতগুলি দরজা আছে সময়ের নীলিমার পাতালের; জ্বলছে গাছ সকল সবুজ মশাল; বাস একটি নক্ষত্র, পুলিশ একটি নক্ষত্র, দোকান একটি নক্ষত্র; আর সমস্তের উপর বরফ পড়ছে’ (অশোককানন)

কিংবা

‘চাঁদের মুখে ঐ ধুলো ছুড়ে মারল পৃথিবী; আর আকাশের ব্রিজ ঝনঝনা তুলে ফের স্থির হয়ে যায় নক্ষত্রের ঢেউয়ের উপর; কেবলই নির্দেশ দিচ্ছে তারা চোখ পিটপিট করে; ‘দুপুর নিভিয়ে, ফুল মেখে নাও কৈশোরবেলায়।’ (জীবন আমার বোন)

পরিচিত বিষয়ের সাথে অদ্ভুত বা উদ্ভট বিষয়ের সংমিশ্রণ করে কবিতা লিখেছেন সৈয়দ মান্নান। পরাবাস্তব পটভূমির অনেক কবিতাই গদ্য-কবিতা হয়ে থাকে। পরাবাস্তব উপাদানের মাধ্যমে প্রচলিত আখ্যানকে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য এই শৈলীটি অত্যন্ত মানানসই। তিন স্তন যুক্ত মেয়েমানুষ (গাধা ও আমি), জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরজায় (অশোককানন), আস্তাবলে বাঁধা তিনটি স্তনের এক মাতাল রূপসি, সিংহের খাঁচায় বসে আমি গল্প লিখছি মনে-মনে, ঘোড়ামানুষের জন্ম দিচ্ছে, নোঙর নেমে গেছে মাটি ভেদ করে পাতালের দিকে, খটখটে মাটির ভিতর উনিশ বছর আমি ছিপ ফেলে বসে আছি আত্মার সন্ধানে, (পাগল এই রাত্রিরা) ইত্যাদির মতো অবাস্তব চিত্রকল্প এঁকেছেন।

ইম্প্রেশনিস্ট কবির প্রধান কাজ হলো আলো ও ছায়া তৈরি করা। আব্দুল মান্নান সৈয়দ কবিতায় আলো-আধাঁরীর খেলা খেলেছেন। তিনি তিন স্তনের মেয়ে মানুষ কল্পনা করেছেন।

‘দুপাশে তোমরা কাতার বানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, চোখের মণিকে জিভ ফলিয়ে চাখো মজা, বাজাও আমিষাশী করতালি, আমার দিকে তাকিয়ে যে—আমি একটা মাছির মতো অসহায়, যে আমাকে তিনটি স্তনের একজন মেয়েমানুষ তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সমুদ্র অবধি, যেখানে একটি মাত্র গাছে সমস্ত ফল ঝোলে আত্মহত্যা ভেবে। জনৈক বৃদ্ধ বৃক্ষ শাদা এবড়োখেবড়ো ডালপালার দাঁত বের করে খুব পরিষ্কার হাসছে, দ্যাখো।’ (গাধা ও আমি)

বাংলাদেশের কবিতায় পরাবাস্তবতা বা অবচেতন মনের কল্পনার সফল ও একক রূপকার কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ। বাস্তবতার নিয়মকানুন ভেঙে ফেলে এক নতুন দৃশ্যপট তৈরি করে তার পরাবাস্তব কবিতায় সাধারণ বস্তুকে অতি-বাস্তব ও রহস্যময় মনে হয়। জাগতিক নিয়ম ভেঙে অবচেতন মনের চিত্রকল্পগুলো অদ্ভুতভাবে ডানা মেলে কল্পনার জগৎ ছাড়িয়ে যায়। ষাটের দশকের কবি মান্নান সৈয়দ শুধু পরাবাস্তবতার কবিতা সৃষ্টি ও বিকাশের জন্যই পেয়েছেন অনন্য সম্মান ও ভিন্নমাত্রা। তিনি অনেক পথ পরিভ্রমণ করেছেন এজন্য। বলা যায়, প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html