২০২৬ সাল। আর এ বছর গড়ে উঠছে এক অপ্রত্যাশিত নতুন ট্রেন্ড। বর্তমানে স্ট্যাটাস বা আভিজাত্যের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে খালি নখ—কোনও নেলপলিশ নেই, নেই কোনও বিশেষ ম্যানিকিউর। শুধু ছোট, পরিষ্কার ও স্বাভাবিক নখই এখন ‘কোয়াইট লাক্সারি’ বা নীরব বিলাসিতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
পুরস্কারের রাত ও রেড কার্পেটে তারকাদের দেখা গেছে কোনো নেলপলিশ ছাড়াই খালি নখে। আর এভাবেই শুরু হয় নতুন এই ট্রেন্ড, যা দ্রুতই বিলাসিতা ও অভিজাত অবস্থানের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী এই প্রবণতাকে ‘বর্ণবাদী’ ও ‘শ্রেণিবৈষম্যমূলক’ বলে সমালোচনা করছেন।
গত এক দশকে নেল আর্টকে অনেক সময়ই আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। জেল বা অ্যাক্রিলিক নখ করালে দুই সপ্তাহ পরপর, কখনও প্রতি সপ্তাহেই সেলুনে যাওয়া প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়তো। কখনও নখের রং নতুন করে করার জন্য, আবার কখনও শুধু নখকে পরিপাটি রাখার জন্যই এই যত্ন নেওয়া হতো। এর সঙ্গে থাকতো সেলুনের বেশ বড় খরচের বিষয়টিও।
তবে গত কয়েক বছরে অনেক ব্র্যান্ডই বাজারে এনেছে কম খরচের ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্য নেল এক্সটেনশন। স্টিকার হিসেবে লাগানো হোক কিংবা আঠা ব্যবহার করে—কয়েক মিনিটেই পাওয়া যাচ্ছে সেলুনের মতো নিখুঁত নখের সাজ।
যেহেতু এখন প্রায় সবাই লম্বা ও নিখুঁতভাবে সাজানো ম্যানিকিউর করা নখের মাধ্যমে নিজের স্টাইল প্রকাশ করতে পারেন, তাই ‘লাক্সারি ট্রেন্ড’-এর ধারা যেন আবার উল্টো দিকে ঘুরেছে। নতুন এই প্রবণতা অনুযায়ী, স্বাভাবিক ও খালি নখই এখন অভিজাত্যের প্রতীক।
খালি নখের নতুন ট্রেন্ড
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গোল্ডেন গ্লোবসের রেড কার্পেটে খালি নখের এই ট্রেন্ডটি ব্যাপক নজর কাড়ে। সেখানে অভিনেত্রী পামেলা অ্যান্ডারসনকে দেখা যায় কোন জাঁকজমকপূর্ণ নেল আর্ট ছাড়াই স্বাভাবিক নখে। এরপর ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডসে রোজামান্ড পাইক ও মার্গট রবির মতো তারকারাও রেড কার্পেটে খালি নখের স্টাইল তুলে ধরেন। অস্কার ও মেট গালার রেড কার্পেটেও অনেক তারকাকে এই ধারা অনুসরণ করতে দেখা যায়।
ফ্যাশনের ক্ষেত্রে মানুষ প্রায়ই তারকাদের অনুসরণ করেন, আর পুরস্কার অনুষ্ঠানগুলো অনেক সময় সারা বছরের জনপ্রিয় ট্রেন্ডের সূচনা করে। রেড কার্পেট থেকে ইনস্টাগ্রাম—সব জায়গাতেই খালি নখ এখন শুধু ২০২৬ সালের বড় সৌন্দর্য ট্রেন্ডের অংশ নয়, এটি ‘ক্লিন গার্ল’ নান্দনিকতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
অনেক তারকাকে দেখা গেছে একেবারে হালকা সাজের নখে—কখন বেইজ রঙের ম্যানিকিউর, কখনও স্বাভাবিক নখের আগা দৃশ্যমান রেখে, আবার কখনও হালকা স্বচ্ছ জেল পলিশের স্তর ব্যবহার করে। এই সাজের মূল আকর্ষণ হলো—পরিপাটি, স্বাভাবিক ও অনাড়ম্বর সৌন্দর্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
এই ট্রেন্ডকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং যেভাবে এটিকে সামাজিক মর্যাদা বা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেটি অনেকের কাছে সমস্যাজনক বলে মনে হচ্ছে। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী ও সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞ এই প্রবণতার সমালোচনা করছেন।
সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা রোডালফো ইনস্টাগ্রামে বলেন, খালি নখ রাখার বিষয়ে তার কোনও আপত্তি নেই। তবে সমস্যা হলো—এটিকে এমন এক ধরনের সৌন্দর্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা অনেক সময় অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও সামাজিক সুবিধাপ্রাপ্তির সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, “আমি এখানে বিভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা ও পরিচয়ের বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করার একটি বড় সমস্যা দেখতে পাচ্ছি। খালি নখকে ‘ভালো রুচি’ বা ‘উচ্চ শ্রেণির’ পরিচয় হিসেবে দেখানো ক্ষতিকর। কারণ এসব ধারণা অনেক সময় শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী সৌন্দর্যের মানদণ্ডেরই ভিন্ন রূপ হয়ে দাঁড়ায়।”
সেশন ম্যানিকিউরিস্ট ও এএমএ সেলনের সহ-মালিক আমা কোয়াশি একই ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, “আমি যেমন নিখুঁতভাবে সাজানো খালি নখ পছন্দ করি, তেমনি ডিজাইন করা সম্পূর্ণ নেল সেটও আমার ভালো লাগে। তবে ‘খালি’ বা ‘ক্লিন গার্ল’ নখকে ‘উচ্চ মর্যাদা’র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার পেছনে যে উদ্দেশ্যমূলক ও বিপজ্জনক ধারণা কাজ করছে, তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।‘’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এটি হয়তো হালকা ও তুচ্ছ কোনও সৌন্দর্যবিষয়ক বিতর্ক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করুন—এই ‘উচ্চ মর্যাদা’র ধারণার মধ্যে কারা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন এবং কাদের ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে? বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা দরকার—এটি বর্ণবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত।”
লাইফস্টাইল কনটেন্ট ক্রিয়েটর মৃণাল এই ট্রেন্ডের সমালোচনা করে বলেন, “ধনী মানুষের কৌশল হলো—প্রথমে এমন কিছু করা, যা সাধারণ মানুষ করতে পারে না। আগে নখ সাজানো বা ম্যানিকিউর করানো ছিল এমন একটি বিষয়, যা সবাই করতেন না। এখন সেই খালি নখকেই বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। আর এভাবেই নিজেকে সাধারণ মানুষের ভিড় থেকে আলাদা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “যখন আপনি দেখেন যে অন্যরাও একই ধরনের নখ সাজানো শুরু করেছে, তখন সেই বিষয়টি আর আলাদা কোনও পরিচয় তৈরি করে না। আর তখনই খালি নখকে বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।”
এই ইনফ্লুয়েন্সার আরও বলেন, এই ট্রেন্ডের একমাত্র ইতিবাচক দিক হলো—এতে কাউকে প্রতি সপ্তাহে নখ সাজানোর চাপ অনুভব করতে হয় না।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর টুইঙ্কল গুপ্ত বলেন, তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই খালি নখের বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন।
তিনি বলেন, “আমি যখন ৩০-এর কাছাকাছি বয়সে পৌঁছাচ্ছি, তখন নিজের জীবনকে অনেক বেশি হিসাব করে দেখছি। আর বুঝতে পারছি, নখ সাজানোর পেছনে আমি কতটা সময় ব্যয় করতাম।”
তিনি বলেন, “পুরো বিষয়টিই আমার কাছে সময়ের অপচয় মনে হচ্ছিল। তাই আমি আর এটি করতে চাইনি।”
তিনি আরও জানান, বিয়ের পর তিনি নিয়মিত নখ সাজানো শুরু করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি লক্ষ্য করেন, এর কারণে তার নখের স্বাভাবিক মান ও স্বাস্থ্য আগের তুলনায় খারাপ হতে শুরু করেছে।
১৯৮০, ১৯৯০ ও ২০০০-এর শুরুর নেলপলিশ ট্রেন্ড থেকে নেল আর্টের যুগ
নব্বইয়ের দশকের শিশুরা বড় হয়েছে এমন দৃশ্য দেখে, যেখানে মা ও খালারা কোনও অনুষ্ঠান বা বিশেষ আয়োজনে যাওয়ার এক দিন আগে কিংবা কয়েক ঘণ্টা আগে নখে নেলপলিশ লাগাতেন। আয়নার সামনে বসে খুব যত্নের সঙ্গে ব্রাশ দিয়ে নখে রং লাগাতেন, যাতে একটি নিখুঁত প্রলেপ তৈরি হয়। আর রং যদি একটু হালকা মনে হতো, তাহলে দ্বিতীয় স্তরও দেওয়া হতো।
মিলেনিয়াল প্রজন্ম বড় হয়েছে পরিবারের নারীদের দেখেই নখ সাজানোর অভ্যাস শিখে। আমাদের অনেকের শৈশবের ছবিতে দেখা যায়, ছোট ছোট হাত ও পায়ের নখে সামান্য রং লাগানো—যার কিছুটা আবার নখের পাশের ত্বকেও ছড়িয়ে গেছে।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলেনিয়ালরা নখে রং করার কৌশল আরও নিখুঁত করে তুলেছে। আগের প্রজন্মের নারীরা যেখানে মূলত লাল ও গোলাপি রঙের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন, সেখানে নব্বইয়ের দশকের শিশুরা বড় হয়ে হলুদ, নীল, সবুজ, মেটালিক, ঝিলমিল ও কালোসহ নানা ধরনের রঙ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে।
যদিও নেল আর্টের ইতিহাস প্রাচীন মিসর, চীন ও ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত, তবে এর আধুনিক জনপ্রিয়তার বিস্ফোরণ ঘটে ২০০০-এর দশকের শেষভাগ এবং ২০১০-এর শুরুর দিকে।
সে সময় হাতে আঁকা নকশা, থ্রিডি চার্ম, কাস্টমাইজড ডিজাইন এবং জেল নেল প্রযুক্তির উন্নতির কারণে নেল আর্ট নতুন মাত্রা পায়। এর ফলে প্রতি সপ্তাহে শত শত মানুষ সেলনে ভিড় করতে শুরু করেন, শুধু নখ সাজানোর জন্য।
এর ফলে অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই পেশাদার নেল আর্টের কোর্সে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো নেল আর্ট শিল্পী ও আগ্রহীদের জন্য বড় ধরনের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
নেল আর্ট দ্রুত জনপ্রিয় ফ্যাশন ট্রেন্ডে পরিণত হয় এবং এটি আভিজাত্যপূর্ণ বা স্টাইলিশ বলেও বিবেচিত হতে থাকে।
তবে কেউ ভাবেনি, একদিন প্রতিদিনের সাধারণ, স্বাভাবিক খালি নখই হয়ে উঠবে সামাজিক মর্যাদা বা অভিজাততার প্রতীক।